আমাদের জাতীয় ঐক্যের জন্য বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ কেন আবশ্যক!
আকতারুল ইসলাম
আমাদের মহান
মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার। এই তিন মহান
দর্শনকে ধারণ করে মুক্তিযোদ্ধারা একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ
নয় মাস লড়াই করে স্বাধীনতার সোনালি সূর্যটি ছিনিয়ে এনেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা
অনুযায়ী এই তিন মহান মূলনীতি কে উপজীব্য করে দেশ পরিচালনার কথা থাকলেও ১৯৭২ সালের
১০ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের রাষ্ট্রপতি, পাকিস্তান থেকে
দেশে প্রত্যাবর্তন করলে পরিস্থিতি পুরোপুরি পাল্টে যায়। বদলে যায় মুক্তিযুদ্ধের
প্রকৃত ইতিহাস।
১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল, শেখ সাহেবের
নির্দেশে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র কে মুক্তিযুদ্ধের চার
মূলনীতি হিসেবে চাপিয়ে দিয়ে একপ্রকার তড়িঘড়ি করে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান
প্রণয়ন করার যাবতীয় আয়োজন সেরে নেওয়া হয়। তবে এখানে প্রশ্নের অবকাশ থেকেই যায়, শেখ মুজিব কেনই
বা কোন ধরনের পূর্বাভাস কিংবা কোন প্রকার পূর্বালোচনা ছাড়াই মুক্তিযুদ্ধের তিন
মূলনীতি থেকে সরে গিয়ে উপরোক্ত চারটি মূলনীতিকে রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি হিসেবে
গ্রহণ করলেন? গণতন্ত্র ছাড়া
বাকি তিন নীতি সুস্পষ্টভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী। বিশেষকরে বাঙালি
জাতীয়তাবাদের মত পশ্চাৎপদ ও ফ্যাসিবাদী মতাদর্শের বিষবাষ্প বাংলাদেশকে এক
অপরিণামদর্শী পরিস্থিতির মধ্যে নিমজ্জিত করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের বহুল আলোচিত বই ‘বিপুলা পৃথিবী’ থেকে জানা
যায় যে ১৯৭২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি, শেখ সাহেব তার প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে কলকাতায় যান এবং
সেখানকার এক জনসভায় প্রদত্ত বক্তৃতায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে বাঙালি
জাতীয়তাবাদ যুক্ত করার বিষয়ে ইঙ্গিত প্রদান করেন। যেহেতু শেখ মুজিবুর রহমান
স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে কোন বক্তব্য, বিবৃতি বা আলোচনা সভায় বাঙালি জাতীয়তাবাদ কিংবা
সুস্পষ্ট কোন রাষ্ট্রীয় মূলনীতির বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেননি। একথা নির্দ্বিধায় বলা
যায় যে তার ভারত সফরের প্রাক্কালে তিনি এসব পশ্চাৎপদ ও উদ্ভট ধ্যান ধারনা আমদানি
করে বাংলাদেশে এনেছেন।
মুজিব প্রণীত ৭২ এর
সংবিধানে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অন্তর্ভুক্তি অবধারিতভাবে দেশকে অস্থিতিশীল করে
তোলে। পাহাড়ে বসবাসরত জনগোষ্ঠীরা নিজেদের নৃতাত্তিক পরিচয় বিসর্জন দিয়ে বাঙালি
জাতিসত্তার পরিচয়কে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি
সমিতির প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন সংসদ সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা বাংলাদেশের খসড়া
সংবিধানের বিরোধিতা করেন এবং শেখ মুজিবুর রহমান কতৃক পাহাড়িদের বাঙালি বলার
প্রতিবাদে ৩১ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ত্যাগ করেন। এর পরের অধ্যায়গুলো ছিল অত্যন্ত করুণ
ও হৃদয়বিদারক। মানবেন্দ্র লারমার শান্তি বাহিনী স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে স্বশস্ত্র
আন্দোলনের পথে হাটেন, যা স্বাধীন
বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনাকাঙ্খিত অধ্যায়ের সূচনা করে।
বাংলাদেশের সিংহভাগ
জনগোষ্ঠী বাংলা ভাষাভাষী হলেও প্রায় পঞ্চাশটির মত ভিন্ন জাতিগোষ্ঠী রয়েছে। তাদের
স্বতন্ত্র ভাষা ও সংস্কৃতি রয়েছে এবং তারা আবহমান কাল থেকে এদেশে বসবাস করছে।
দেশের প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে তাদের রয়েছে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং দেশের অর্থনৈতিক
সমৃদ্ধি ও বিকাশের পথে তারা পালন করে চলেছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। অথচ বাঙালি
জাতিসত্তার পরিচয়কে মুখ্য করে তোলার অনভিপ্রেত প্রচেষ্টা পাহাড়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে
ক্ষোভের সঞ্চার করে এবং তাদের মধ্যে রাষ্ট্রের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে
বিবেচিত হবার শঙ্কা তৈরি করে।
রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে
বাঙালি জাতীয়তাবাদের মত হঠকারী নীতির প্রবর্তন বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে অবাঙালির
মধ্যে যে অযাচিত বিভাজন সৃষ্টি করেছিল তা দূর করতে জিয়াউর রহমান বাঙালি
জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে জনগণের নাগরিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ কে
রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। জিয়ার প্রতিষ্ঠিত জাতীয়তাবাদ
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে আরও সুস্পষ্ট করে তোলে এবং এই ভৌগলিক পরিমন্ডলে
বসবাসরত জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র পরিচিতি বৈশ্বিক পরিমন্ডলে সুস্পষ্ট করে তুলে ধরে।
দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ
ছাড়াও মিয়ানমারের আরাকান,
এবং ভারতের
পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা ও
অন্যান্য অঞ্চলে বাঙালি জনগোষ্ঠীর বসবাস। এই বৃহৎ বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে
বাংলাদেশের বাঙালি জনগোষ্ঠীর ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির যথেষ্ট সাদৃশ্য থাকলেও
আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনেকাংশে আলাদা। আমাদের ইতিহাস, ধর্মীয় সংস্কৃতি
ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য বাঙালি জনগোষ্ঠী থেকে আমাদের খুব
সহজেই পৃথক করে দেয়। তাছাড়া আমাদের রয়েছে এক পৃথক ও স্বাধীন-সার্বভৌম ভূখন্ডের
মালিকানা।
বাংলাদেশের বাংলা
ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে তার পরিচিতি বৈশ্বিক
পরিমন্ডলে তুলে ধরে এবং এই পরিচিতি তার নৃতাত্ত্বিক নয়, নাগরিক সত্তার
উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এই নাগরিক পরিচিতি তাকে পাহাড় ও সমতলের ভিন্ন ভাষাভাষী
জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া ঘটিয়ে মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। বাংলাদেশের নাগরিক
হিসেবে বিকশিত হবার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
অধুনা রাষ্ট্র ব্যবস্থায়
নাগরিক পরিচিতি একটা দেশে বসবাসরত জনগণের মধ্যে শক্তিশালী সেতু বন্ধন নির্মাণ করে
এবং বিশ্ব নাগরিক হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে
শক্তিশালী যোগাযোগ গড়ে তুলতে নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করে। নাগরিক পরিচয়ের উপর গড়ে
ওঠা জাতীয়তাবাদী চেতনা রাষ্ট্রের সকল নাগরিককে একটা চিরাচরিত রীতিনীতি ও
মূল্যবোধের চর্চায় উদ্বুদ্ধ করে এবং একটা স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের অংশীদার হিসেবে
ইতিহাসের পাটাতনে প্রতিষ্ঠিত হতে অনুপ্রাণিত করে। অপরদিকে, নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের
ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত জাতীয়তাবাদ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে বিভাজন রেখা টেনে দেয়
এবং দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের শঙ্কা বাড়িয়ে দেয়।
মাকিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ
পশ্চিমা বিশ্বের অধিকাংশ দেশে নাগরিক পরিচিতিকে রাষ্ট্রের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে
বিবেচনা করা হয় এবং ভিন্ন দেশ থেকে আগত অভিবাসীদের নাগরিকত্ব প্রদান করার ক্ষেত্রে
তাদের মধ্যে সে দেশের নাগরিক সত্তাকে ধারণ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়।
উদার নৈতিকতা ও পারস্পরিক
সহনশীলতা নাগরিক জাতীয়তাবাদের মূল বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ৫৪ বছরের
ইতিহাসের অধিকাংশ সময় জুড়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের নামে একটা বিশেষ শ্রেণি অন্যান্য
জাতি সম্প্রদায়ের প্রতি উন্নাসিকতা প্রদর্শন ও সীমাহীন বৈষম্য তৈরি করে যে
বিভাজনের সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল তা আমাদের পশ্চাৎপদতার জন্য অনেকাংশে দায়ী।
তবে আশার কথা হলো বাঙালিয়ানার জিকির তোলা সেই শাসক শ্রেণীটির বৈষম্যের সিংহাসন
তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে। দেশবাসীর সামনে নতুন করে সুযোগ এসেছে
মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবার।
২০২৪ সালের জুলাই আগস্টের
গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে পরিবর্তিত পরিস্থিতি, বাংলাদেশিদের সামনে বহুল কাঙ্খিত কল্যাণ
রাষ্ট্র বিনির্মাণের অবারিত সুযোগ ও সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। আমাদের
ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টাই পারে একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়তে। আমাদের
যাবতীয় মত, পথ ও জীবনাদর্শ
সর্বদা আবর্তিত হোক বাংলাদেশের বৃত্তাকার কক্ষপথে। বাংলাদেশের নাগরিক পরিচিতি হোক
আমাদের জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি।
Comments
Post a Comment